Friday, March 6, 2026

কানাডার মন্ট্রিয়ালে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন

বিবাংলা ডেস্ক
০ মন্তব্য ৩৬০ views

কানাডার মন্ট্রিয়ালে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন

 

কানাডার মন্ট্রিয়ালভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অ্যাগেইনস্ট অ্যাট্রোসিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স অন হিউম্যানিটি ১৯৭১ সালের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে মন্ট্রিয়ালের মুন স্টার রেস্টুরেন্টে এক আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর বিজয়ের মাত্র দু’দিন আগে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা পরিকল্পিতভাবে এই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে।

শহীদ বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন জাতি গঠনের অগ্রদূত—চিকিৎসক, অধ্যাপক, আইনজীবী, সাংবাদিক, লেখকসহ বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের প্রাক্কালে প্রায় এক হাজারের মতো বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে, যাতে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য ও পঙ্গু করে দেওয়া যায়। তবে তাদের এই ঘৃণ্য উদ্দেশ্য সফল হয়নি, যদিও প্রতিশোধের রাজনীতি থেমে থাকেনি।

অনুষ্ঠানটি দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম পর্বে ছিল শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা। দ্বিতীয় পর্বে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—যেখানে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা নির্যাতিত নারী-পুরুষদের স্মরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মিসেস ইশরাত আলম, চেয়ারপারসন, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অ্যাগেইনস্ট অ্যাট্রোসিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স অন হিউম্যানিটি, মন্ট্রিয়াল। প্রধান অতিথি ছিলেন মুনশি বশীর, সভাপতি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, কুইবেক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিশির ভট্টাচার্য (সাবেক পরিচালক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), সাজ্জাদ হোসেন সুইট (সংগঠনিক সম্পাদক, কানাডা আওয়ামী লীগ), তাজুল মোহাম্মদ (মুক্তিযোদ্ধা), সি বি সিং (সভাপতি, ইন্ডিয়া–কানাডা অ্যাসোসিয়েশন অব মন্ট্রিয়াল) প্রমুখ।

অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন ফাতেমা বেগম (সহকারী শিক্ষক, বাংলা ভাষা, মন্ট্রিয়াল), সুশান্ত বড়ুয়া (উপদেষ্টা, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স), শাহ আলম মোল্লা (ব্যবসায়ী), বজলুর রশীদ (সভাপতি, মুন্সিগঞ্জ অ্যাসোসিয়েশন), ইয়াকুব (মুক্তিযোদ্ধা), মাসুদ খান (সম্পাদক, দ্য স্টার এভিস), আব্দুল বাসেত ও আব্দুল গফুর।

সভাপতির বক্তব্যে মিসেস ইশরাত আলম বলেন, গণআন্দোলন সৃষ্টি করেছেন সাধারণ মানুষ, আর সেই আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছেন বুদ্ধিজীবীরা। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা বুঝে গিয়েছিল বাঙালিকে আর পরাজিত করা যাবে না, তাই তারা নতুন রাষ্ট্রকে বুদ্ধিজীবীশূন্য করতে চেয়েছিল।
মুনশি বশীর বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ১,১১১ জন বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে, যদিও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তালিকায় শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা ৫৬০।

ইশরাত আলম আরও বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও আত্মস্বার্থপর রাজনীতির কারণে আমরা পরাজয়ের মুখোমুখি হচ্ছি। দেশে আজ বাকস্বাধীনতা নেই, এমনকি সাংবাদিকরাও নিরাপদ নন। সত্য বলার কারণে খ্যাতনামা সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে ইউনুস সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে—এ খবর আমাদের জানা গেছে। ১৯৭১ সালে শহীদ বুদ্ধিজীবীরাও সত্য বলেছিলেন এবং প্রতিবাদ করেছিলেন। দমন-পীড়নের মাধ্যমে কোনো জাতিকে দমিয়ে রাখা যায় না। বাংলাদেশে তথাকথিত সাধারণ নির্বাচনের নামে একটি প্রহসন মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে। ভারত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা উচিত। কিছু মহলের ভারতবিরোধী বিদ্বেষের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ভারত অতীতে আমাদের বন্ধু ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। কোনো দেশই একটি নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের জন্য হতে পারে না।

তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল একটি প্রগতিশীল সমাজ গড়া। কিন্তু আজ বাস্তবতা ভিন্ন। ধর্ম রাজনীতির অংশ হতে পারে না। কানাডায় একসময় রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব ছিল, কিন্তু তারা বুঝেছে—ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা থাকা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের শত্রুরাই আজ দেশ দখল করে নিয়েছে। জনগণ, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের কোনো অধিকার বা বাকস্বাধীনতা নেই। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সশস্ত্র শাখা আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকারদের সমালোচনা করায় সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

শিশির ভট্টাচার্য বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে—বিশেষ করে বাংলাদেশে—হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে এক ধরনের অচিকিৎসিত বিদ্বেষ বিদ্যমান, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পথে বাধা। এই বিদ্বেষ থেকেই ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং সাম্প্রতিক সংকট তৈরি হয়েছে। ইতিহাস প্রমাণ করে, বিদ্বেষের চিকিৎসা না হলে রক্তপাত চলতেই থাকে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সমাজ এখন দুই ভাগে বিভক্ত—একদল ১৯৭১-এর স্বাধীনতার পক্ষে, আরেকদল তার বিপক্ষে। দেশে যা কিছু খারাপ ঘটে, তার জন্য প্রমাণ ছাড়াই ভারতকে দায়ী করা হয়।

তাজুল মোহাম্মদ মুক্তিযুদ্ধের আগের ও চলাকালীন ভয়াবহ দিনগুলোর বর্ণনা দেন। ইয়াকুব মুক্তিযোদ্ধা বর্তমান দমনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বান জানান।
সি বি সিং স্মরণ করেন, তাঁর পরিবারের দুই সদস্য ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন।
মাসুদ খান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার, কারণ স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে।

সাংস্কৃতিক পর্বে কবিতা আবৃত্তি করেন রাবেয়া হোসেন ও মুফতি ফারুক। সংগীত পরিবেশন করেন নাজনিন নিশা, শাফিনা করিম ,প্রণব মিঠু(গ্লোবাল সাংস্কৃতিক সম্পাদক)

আলোচনা পর্বটি পরিচালনা করেন গ্লোবাল alliance এর যুগ্ম সম্পাদক সৈয়দ জাহাঙ্গীর।

সাংস্কৃতিক পর্বের উপস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন শাফিনা করিম।

অনুষ্ঠানটি কবিতা ও সংগীতের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের প্রত্যাশা এবং মৌলবাদী ও দমনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়।
জাকুয়ান নিউজটি প্রিন্টে দাও।

আরো পড়ুন

একটি মন্তব্য লিখুন

আমাদের সম্পর্কে

বাঙালীর সংবাদ বাংলা ভাষায়, সবার আগে সেরা সংবাদ পেতে বি-বাংলা ভিজিট করুন।

আজকের সর্বাধিক পঠিত

নিউজলেটার