ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্য ও রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করে বিতর্কে অধ্যাপক কামরুল হাসান।
ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের প্রাচীনতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ প্রবল সমালোচনার মুখে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যটন ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এমবিএ কো-অর্ডিনেটর ড. কামরুল হাসান বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নৃত্য ও রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন নিষিদ্ধ করার অভিযোগে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তিনি নৃত্যকে “পাপ” আখ্যা দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে “বিদেশি সংস্কৃতি” হিসেবে অপমানজনক মন্তব্য করেন। কয়েক সপ্তাহের প্রস্তুতির পর হঠাৎ করেই তিনি নৃত্য ও রবীন্দ্রসঙ্গীত বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং নিজের পছন্দের কিছু কবিতা পাঠ ও গান রাখেন। শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করলে তাদের উপস্থিতি নম্বর কেটে দেওয়ার মতো শাস্তিমূলক পদক্ষেপও নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনাকে কেবল ব্যক্তিগত মতামত বা ভুল সিদ্ধান্ত বলা যাবে না। এটি সরাসরি সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত এবং বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের প্রতি এক অশ্রদ্ধাজনক আক্রমণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোনো বিদেশি নন—তিনি জাতির কবি, জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের মূলে প্রতিষ্ঠিত এক মহীরুহ। তাঁকে ‘বিদেশি’ আখ্যা দেওয়া কেবল অজ্ঞতাই নয়, সাংস্কৃতিক বিশ্বাসঘাতকতা।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ দমাতে ড. হাসান উপস্থিতির তালিকায় তাদের নাম কেটে দেন বা কোর্সে ফেল করানোর হুমকি দেন। এটি শিক্ষকের দায়িত্বের পরিপন্থী এবং ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকশিত করার বদলে ভয় দেখিয়ে দমন করবেন—এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান-মর্যাদার সঙ্গে একেবারেই সাংঘর্ষিক।
পরিস্থিতি আরও নিন্দনীয় হয়েছে ড. হাসানের পরবর্তী বক্তব্যে। তিনি দাবি করেন, “কাউকে নিষেধ করিনি, কেবল দায়িত্বশীল আয়োজক ছিল না।” এই ব্যাখ্যা স্পষ্টতই অসত্য এবং ভণ্ডামিপূর্ণ। আসল ঘটনা হলো, তিনি নিজের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।
শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যেই লিখিত অভিযোগ করেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ করেছে। তাদের প্রতিবাদ প্রমাণ করে, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় তারা পিছপা নয়। কিন্তু এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াবে, নাকি এক অসহিষ্ণু শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারিতা নীরবে মেনে নেবে?
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তচিন্তা, গণআন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক। সেই বিশ্ববিদ্যালয় যদি আজ নীরব থাকে, তবে এটি শুধু একটি বিভাগের নয়, গোটা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাকে কলঙ্কিত করবে।
এ বিতর্ক আর কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে নয়। এটি শিক্ষার্থীদের মুক্তচেতনা, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতার প্রশ্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সে কি দাঁড়াবে শিক্ষার্থীদের পাশে এবং জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে, নাকি মাথা নত করবে অজ্ঞতা ও অসহিষ্ণুতার কাছে?
