Thursday, April 23, 2026

সংকটে শ্রমবাজার, ফেরত আসছে বাংলাদেশিরা

বিবাংলা ডেস্ক
০ মন্তব্য ২৬ views

যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার ইতালি থেকে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। আগামী ২০ এপ্রিল ৩০ বাংলাদেশিকে চার্টার্ড ফ্লাইটে ফেরত পাঠানোর কথা। ইতালি সরকার ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি দিয়েছে। গতকাল সোমবার ইমিগ্রেশন পুলিশের একটি সূত্র থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগেও ইতালি থেকে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো হয়েছে।

অবৈধ অভিবাসন, অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ, ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বেশ কিছু দেশের ভিসায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আবার ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের কারণেও বাংলাদেশিদের জন্য তৈরি হয়েছে ভিসা জটিলতা। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে মানব পাচারের ঘটনাও ঘটছে।

গত ৮ এপ্রিল কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের ১৩টি দেশ বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি নির্দেশনা পাঠিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও অভিবাসন নীতিতে আকস্মিক এক পরিবর্তনের কারণে সংকটের মুখে পড়ে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র বিভাগ (ডিপার্টমেন্ট অব হোম অ্যাফেয়ার্স) বাংলাদেশকে ‘প্রমাণের স্তর ৩’ বা সর্বোচ্চ ঝুঁকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই সিদ্ধান্তের কারণে ভিসা পাওয়ার শর্তাবলি আগের চেয়ে বেশি কঠোর হয়েছে।

ভিসা বন্ধ বা কড়াকড়ি, উচ্চশিক্ষার জন্য নানা শর্তসহ বিদেশে কর্মসংস্থান সীমিত হয়ে যাওয়ায় অভিবাসন খাত এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ এই পরিস্থিতিকে আরও নেতিবাচক করে তুলতে পারে।

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে অবৈধ বাংলাদেশিদের এর আগেও ফেরত পাঠানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি পরিবর্তনের আওতায় ‘ভিসা বন্ড’ তালিকায় বাংলাদেশের নাম যুক্ত করা হয়েছে। গত বছরের মার্চ থেকে এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত এসেছে অন্তত ২৪৮ জন। যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে তাদের মধ্যে অনেককে শিকল ও ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে অমানবিক কায়দায় পাঠানো হয়।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ইতালি থেকে ২০ এপ্রিল চার্টার্ড ফ্লাইটে যাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে তারা সেখানে অবৈধভাবে বসবাস করছিলেন। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথা থাকলেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে ফ্লাইটের সূচি বদল হয়।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইতালিতে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি বসবাস করেন। ২০১৫ সালের অক্টোবরে কারিতাস-মিগ্রান্তেস ফাউন্ডেশনের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়, দেশটির মোট কর্মশক্তির ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বিদেশি নাগরিক। ইতালিতে বসবাসরত বিদেশিদের প্রধান উৎস দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে রোমানিয়া, মরক্কো, আলবেনিয়া, ইউক্রেন ও চীনকে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেরু ও বাংলাদেশ থেকে আসা নাগরিকের সংখ্যা বেড়েছে। ইতালির অর্ধেকেরও বেশি প্রদেশে নতুন ইস্যু করা রেসিডেন্স পারমিট বা বসবাসের অনুমতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা এখন শীর্ষ তিনটি দেশের মধ্যে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত আসা ব্যক্তিদের কয়েকজন সমকালকে জানান, প্রথমে তারা ব্রাজিলে যান। সেখান থেকে মেক্সিকো হয়ে অবৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। এভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে তাদের জনপ্রতি প্রায় ৪৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্তও খরচ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর অনেকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় মার্কিন প্রশাসন তাদের প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত নেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত ২০ জানুয়ারি এক নারীসহ ৩৬ জনকে ফেরত পাঠানো হয়। এর আগে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর ৩১, ২৮ নভেম্বর ৩৯, ৪ সেপ্টেম্বর এক নারীসহ ৩০, ২ আগস্ট ৩৯, ৪ জুন ৪২, ৬ মার্চ থেকে ২১ এপ্রিল একাধিক দফায় ৩৪ জন ফেরত এসেছেন।

ইউরোপ থেকে ফেরত
বিদেশ থেকে ফেরত আসা ব্যক্তিদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় আর্থিক, মানসিক ও মানবিক সহায়তা করে থাকে ব্র্যাক। বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস (এসওপি) চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির ভিত্তিতে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া যারা ইউরোপে গেছেন, তাদের ফেরত আনা হচ্ছে।
গত আট বছরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় চার হাজার ব্যক্তি ফেরত এসেছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাইপ্রাস থেকে এসেছেন। দেশটি থেকে এসেছেন ৭৬৭ জন, ইতালি থেকে ৭৪৫, রোমানিয়া থেকে ৫১০, জার্মানি থেকে ৪২৪, ফ্রান্স থেকে ৪১৫, গ্রিস ৩৮০, মাল্টা ৩৩১, অস্ট্রিয়া ৮০, বুলগেরিয়া ৩৬, সুইডেন ৩৫, পর্তুগাল ২৮, ডেনমার্ক ১৯, স্পেন ১৯, পোল্যান্ড ১৬, বেলজিয়াম ৯, চেকপ্রজাতন্ত্র ৯, লাটভিয়া চার, ফিনল্যান্ড তিন, এস্তোনিয়া দুই, আয়ারল্যান্ড দুই, নেদার‍ল্যান্ডস দুই, স্লোভেনিয়া দুই, লিথুনিয়া থেকে দুজন।

ভরসার মধ্যপ্রাচ্যে শঙ্কা
বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ বা ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জন গিয়েছেন সৌদি আরবে। দ্বিতীয় প্রধান গন্তব্য কাতার। এরপর রয়েছে সিঙ্গাপুর, কুয়েত, মালদ্বীপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান।
যুদ্ধের কারণে কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক উপসাগরীয় দেশ তাদের বেশ কিছু কার্যক্রমের গতি কমিয়ে দিয়েছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। এতে অভিবাসী শ্রমিকরা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।

এমন পরিস্থিতিতে নিয়মিতভাবে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে প্রবেশ করে সেখান থেকে ফেরত আসার ঘটনা নেতিবাচক বার্তা দেবে। এতে অন্যান্য দেশের জন্য ভিসা জটিলতা বা কড়াকড়ি আরও বাড়ার শঙ্কা তৈরি করবে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)ভুক্ত ছয়টি দেশ– সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫ দশমিক ৪০ শতাংশ এসেছে এই ছয়টি দেশ থেকে।

ভিসা সুবিধা কমছে 
বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইতালি, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের ভিসা সুবিধা কমেছে। এসব দেশে ভিসা পেতে নানা জটিলতাও তৈরি হচ্ছে। অনেক দেশ অন অ্যারাইভাল ভিসাও বন্ধ করে দিয়েছে।

বিদেশফেরতদের জন্য সহায়তা
ফেরত আসা ব্যক্তিদের কীভাবে সহায়তা করা হচ্ছে–জানতে চাইলে ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান সমকালকে বলেন, জোরপূর্বক বা স্বেচ্ছায় যেভাবেই হোক, বাংলাদেশে আসার পর তাদের পুনরেকত্রীকরণ (রিইন্টিগ্রেশন) সহায়তা দেওয়া হয়। বিমানবন্দরে জরুরি সহায়তা, কাউন্সেলিং ও উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থিক সহায়তা করা হয়।
এ পর্যন্ত ইউরোপ থেকে ফেরত আসা কতজনকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে শরিফুল হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশ চায় না অনিয়মিত পন্থায় লোকে বিদেশে যাক। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে ইউরোপ থেকে ফেরত আসা সবচেয়ে বেশি লোককে আমরা সহায়তা করছি। তারা এসেছেন সাইপ্রাস, ইতালি, রোমানিয়া, জার্মান, ফ্রান্স, গ্রিস ও মাল্টা থেকে।’

বাংলাদেশিরা ঝুঁকি নিয়ে যেন ইউরোপে না যান, সে জন্য সারাদেশে ব্র্যাক সচেতনতা তৈরির কাজ করে। শরিফুল হাসান বলেন, এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকরা এক ধরনের অনিশ্চয়তায় রয়েছে। শত শত ফ্লাইট বিপর্যয়ের কারণে অনেকে সময়মতো কাজে যোগ দিতে পারেননি। আবার মধ্যপ্রাচ্যে নতুনভাবে কাজের অনুমতি পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে যাওয়ার সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটি প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

আরো পড়ুন

একটি মন্তব্য লিখুন

আমাদের সম্পর্কে

বাঙালীর সংবাদ বাংলা ভাষায়, সবার আগে সেরা সংবাদ পেতে বি-বাংলা ভিজিট করুন।

আজকের সর্বাধিক পঠিত

নিউজলেটার