বন্দর হস্তান্তরের আগেই প্রতিবাদ দমনে পুলিশের নিষেধাজ্ঞা
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম:
দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার বিতর্ক যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই যেকোনো ধরনের প্রতিবাদ ও আন্দোলন অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে কঠোর অবস্থানে গেল প্রশাসন। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) আজ এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বন্দর ও এর আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে আগামী ৩০ দিনের জন্য সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ ১৯৭৮ এর ৩০ ধারার ক্ষমতাবলে সিএমপি কমিশনার চট্টগ্রাম বন্দরের আশেপাশে সব সভা সমাবেশ মিছিল মিটিং নিষিদ্ধ করেছেন এক মাসের জন্য। সিএমপির অধ্যাদেশের ৩০ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, জনগণের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে।
বন্দরের আশেপাশে দেশপ্রেমিক সচেতন নাগরিক আন্দোলন করলে জনগণের নিরাপত্তা কিভাবে বিঘ্নিত হয়? ইতিহাসে কখনো এরকম কিছু হয়েছিল? আর নির্বিঘ্নে আমদানি রপ্তানি পণ্য আনা নেয়ার সাথে জন নিরাপত্তার সম্পর্ক কি?
মূল কথা চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে বিদেশি বেনিয়াদের যে থাবা বিস্তারের চেষ্টা চলছে তা তো দেশের সবাই জানে। টেন্ডার ছাড়া টার্মিনাল দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। কদিন পর পর বিদেশি জাহাজ আর বিদেশি লোকজন ঘুরে যাচ্ছে। এসব জেনে প্রতিবাদী জনতা পথে নামতে পারে সেই ভয়ে এই নিষেধাজ্ঞা।
চট্টগ্রাম বন্দরের আশেপাশে নিকট অতীতে এমন কিছুই হয়নি যে নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। নিষেধাজ্ঞার বেড়া দিয়ে দেশের সম্পদ বিদেশি প্রভুদের হাতে তুলে দেয়ার চেষ্টা ইউনুস সরকারের ।
এই পদক্ষেপকে বন্দর বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা জনমত এবং সম্ভাব্য আন্দোলনকে দমনের একটি সুপরিকল্পিত ‘আগাম বার্তা’ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিএমপির পক্ষ থেকে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের প্রধান কেন্দ্র। বন্দরের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখা জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে অপরিহার্য। বন্দর এলাকায় মিছিল-সমাবেশের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়ে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটে, যা দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। জাতীয় স্বার্থ ও শৃঙ্খলা রক্ষার যুক্তিতেই চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশের ক্ষমতাবলে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
তবে এই নিষেধাজ্ঞার সময়কাল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। সরকার যখন চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে, তখন এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে এই নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় বিষয়টি কাকতালীয় বলে মানতে নারাজ তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রভাবশালী শ্রমিক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এটি আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। সরকার আলোচনার পথে না হেঁটে, গায়ের জোরে দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে চায়। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের দাবি জানাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা প্রমাণ করে সরকার জনগণের কণ্ঠ শুনতে ভয় পায়।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, বন্দরের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনার ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সরকার আলোচনার মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করে দমন-পীড়নের পথে হাঁটলে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে বন্দরনগরীতে একটি থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা আগামী দিনে সরকার এবং বন্দর রক্ষা করতে চাওয়া আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করছে।
- #চট্টগ্রামবন্দর #বন্দরনিষেধাজ্ঞা #বন্দরহস্তান্তর #সিএমপি #প্রতিবাদদমন
