Thursday, April 23, 2026

৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার ঋণ — কোথায় গেল এত টাকা

বিবাংলা ডেস্ক
০ মন্তব্য ১০৫ views

৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার ঋণ — কোথায় গেল এত টাকা?

নন-প্যারফর্মিং ঋণের পাহাড়, বিনিয়োগ ঠেক এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা

ঢাকা, ১১ অক্টোবর ২০২৫ — মাত্র এক বছরের মধ্যে ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার ঋণ—এমন একটি অঙ্কের ঋণকে ঘিরে জনগণের মধ্যে প্রশ্নগুলোর স্রোত বয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতি কি টিকবে? এই ব্যাপক ঋণটা কোথায় খরচ হচ্ছে?
নিচে বিশ্লেষণ, প্রেক্ষাপট ও প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো।

বর্তমান পরিস্থিতি ও ঋণের চিত্র

২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি–মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নন-প্যারফর্মিং ঋণ (NPL) একক প্রান্তিকে প্রায় ৭৪,৫৭০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পায় এবং মোট NPLও দাঁড়ায় প্রায় ৪.২০ লাখ কোটি টাকা।

এ সময় আনভেরিফায়েড ঋণ এখন মোট প্রদানকৃত ঋণের প্রায় ২৪.১৩ % — অর্থাৎ প্রতি ৪ টাকার মধ্যে ১ টাকা “ঝুঁকিপূর্ণ” হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ব্যাংকিং খাতের ডিফল্ট ঋণ (Bad Loans) এখন প্রায় ৩.৪২ লাখ কোটি টাকা — যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১০০ % প্রোভিশন (যে পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করতে হবে) দাবী করে।

NBFI (Non-Bank Financial Institutions) সেক্টরেও অবস্থা গুরুতর। ২০২৪ সালের মার্চে NBFI-গুরুর অনেক ঋণ অনগ্রসর হয়েছে — প্রায় ২৭,১৮৯ কোটি টাকা নন-প্যারফর্মিং ঋণ হিসেবে চিহ্নিত।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকের নন-প্যারফর্মিং ঋণের অনুপাত ছিল প্রায় ১৬.৯ %

এই তথ্যগুলোর আলোকে, বলা যায় — দেশের ব্যাংক খাত বহু আগে থেকে “গলায় শেকড়” ধরে আছে।

কী কারণে ঋণ বোঝা এত দ্রুত বেড়েছে?

1. ঋণ পুনর্গঠন ও ছদ্ম উন্নয়ন
আগের সরকারের সময় অনেক বড় চুক্তি ও ঋণ পুনর্গঠন করা হয়েছিল, এমনকি বহু ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে বোঝা গোপন করা হয়েছিল। নতুন প্রশাসন কঠোর নিয়ম চালু করায় প্রকৃত চিত্র ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে।

2. দুর্নীতি ও অনিয়ম
শক্তি ও অবকাঠামো প্রকল্পে অনিয়ম, চুক্তি হাতবদল এবং তুলনামূলক ব্যয় বাড়ানো—এগুলো সবই সন্দেহের অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে বিদ্যুৎ চুক্তি, LNG ও আদানি ইস্যু যুক্ত চুক্তিগুলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনায় রয়েছে।

3. কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক বাহিনীর সীমাবদ্ধতা
অতীতে ঋণ শ্রেণিবিন্যাস ও প্রোভিশন নির্ধারণে ঝুঁকিপূর্ণ নীতিমালা ও রাজনৈতিক চাপ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোরভাবে নজরদারি শুরু করেছে, তাই অনেক পুরনো “গোপন” ঋণ এখন সামনে আসছে।

4. নম্ন বিনিয়োগ ও অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা
রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ ব্যয় ও কররাজস্ব ঘাটতির কারণে বেসরকারি বিনিয়োগে প্রবাহ সীমিত। বিভিন্ন সংবাদ বিশ্লেষণ বলছে, দেশের বিনিয়োগ প্রবণতা প্রচন্ডভাবে ঠেকছে।

5. সুদ ও ঋণশুক্তি বাড়ানো
ঋণের বোঝা বাড়লে সুদ খরচ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে, যা বাজেট থেকে উন্নয়ন ও সামাজিক খাত ছিনিয়ে নেবে। অনেক প্রকল্পসূচি, বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ফলপ্রসূতা না থাকা, টাইম বেস প্রয়োজনে পড়া, অতিরিক্ত খরচ—এসব মিলিয়ে ঋণ ব্যবহার অধিক হয়।

সংক্রমণ: ব্যাংক খাত ও অর্থনীতিতে বিপদ

ব্যাংকগুলোর কার্যকর ঋণদান ক্ষমতা কমে যাচ্ছে কারণ ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগুলোর জন্য অনেক টাকা “ক্ষতিপূরণ” হিসেবে রাখা হচ্ছে।

নতুন প্রকল্প বা উদ্যোক্তা ঋণ পেতে বাধা পাচ্ছেন — কারণ ব্যাংকগুলি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নয়।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাচ্ছে, এবং জনসাধারণের আস্থা কমছে।

দেশীয় মুদ্রার মান এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বেড়ে যেতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতারা সরকারি অথবা রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে সুরক্ষা পেতে পারে, যা বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর প্রশ্ন তোলে।

উদাহরণ ও ইস্যু: আদানি ও বিদ্যুৎ চুক্তি

নতুন সরকারের অধীনে একটি বিরাজমান বিতর্ক হচ্ছে আদানি গ্রুপের ৫০০ মিলিয়ন ডলার পাওনা নিয়ে — বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তি ও বিল আদায় নিয়ে গড়পড়তা অর্থনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে।

এই চুক্তির শর্ত, দেরি বিল প্রদান এবং উচ্চ চুক্তির মূল্য — এসব বিষয় নিয়ে সংবাদ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

প্রস্তাব ও পথনির্দেশিকা

1. ঋণ ব্যবস্থাপনা একক “Debt Office” গঠন
সমস্ত দপ্তরের ঋণ ও দায়-দায়িত্ব এখানে একসঙ্গে বিশ্লেষণ হবে, দুর্নীতি ও দ্বৈত হিসাব এড়ানো যাবে।

2. দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও জবাবদিহিতা
অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও শক্ত আইন প্রয়োগ, যাতে ভবিষ্যতে অনিয়মের পথ বন্ধ হয়।

3. প্রকল্প খরচ ও চুক্তির স্বচ্ছতা
প্রকল্প পরিকল্পনা, দরপত্র, মূল্যায়ন, চুক্তির শর্ত — সব ধাপ জনসাধারণের নজরে আনা হবে।

4. নিয়ন্ত্রক ও নজরদারি শক্তিশালী করা
কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অডিট সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সক্ষমতা বাড়িয়ে নিয়ম কঠোর করা।

5. কর রূপান্তর ও রাজস্ব বৃদ্ধি
কর সংগ্রহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, কর ফাঁকি ও দুর্নীতি হ্রাস করা এবং করদাতাদের সম্পূর্ণ সাপেক্ষিক সুযোগ দেওয়া।

6. ঋণ পুনর্বিন্যাস এবং পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা
দুর্বল ঋণগুলোর পুনর্বিন্যাস ও দ্রুত পারিশ্রমিক ব্যবস্থা গঠন, বিশেষ করে আইনি ও আদালত প্রক্রিয়া দুর্বোধ্যতা কমানো।

7. বিনিয়োগ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা
নির্ধারিত ক্ষেত্র যেমন গ্রিন প্রযুক্তি, মেধা ভিত্তিক স্টার্টআপ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো — সেসব ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় প্রণোদনা দেওয়া।

আরো পড়ুন

একটি মন্তব্য লিখুন

আমাদের সম্পর্কে

বাঙালীর সংবাদ বাংলা ভাষায়, সবার আগে সেরা সংবাদ পেতে বি-বাংলা ভিজিট করুন।

আজকের সর্বাধিক পঠিত

নিউজলেটার