Saturday, March 7, 2026

কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশনও যাচ্ছে বিদেশিদের হাতে!

বিবাংলা ডেস্ক
০ মন্তব্য ৭৩ views

কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশনও যাচ্ছে বিদেশিদের হাতে!

বিশেষ প্রতিনিধি,

অচল অবকাঠামো পরিচালনার ‘অজুহাত’ দেখিয়ে লাভজনক সম্পত্তি বিদেশি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু; জনগণের অর্থ অপচয়ের পর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে সরকার

দেশের অন্যতম মেগা প্রকল্প দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের ৬ তলা বিশিষ্ট আইকনিক স্টেশন ভবনটি ২১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হলেও দেশীয় প্রশাসনের চরম অব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনার অভাবে এটি এখন ‘অন্ধকার বোঝা’য় পরিণত হয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের সরকারি বিনিয়োগকে সচল করতে ব্যর্থ হওয়ার পর, বিভিন্ন ‘অজুহাত’ দেখিয়ে অবশেষে এই লাভজনক স্থাপনার পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে রেল কর্তৃপক্ষ।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান আগেই সতর্ক করেছিলেন—সঠিক পরিকল্পনা ও পরিচালনার অভাবে শত কোটি টাকার বিশাল এই স্টেশনটি এখন ‘বিনিয়োগের রিটার্ন না আসা এক বোঝা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে দেশীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি এবং অবকাঠামো পরিচালনায় আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সেই গুরুত্বপূর্ণ আহ্বানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে।

অচলতার অজুহাত: যা ছিল, যা নেই

কর্তৃপক্ষ এখন ‘আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা’ এবং ‘অপারেশনাল জটিলতা’র অজুহাত দেখালেও, প্রকৃত ব্যর্থতা লুকিয়ে আছে অভ্যন্তরে। রেল মন্ত্রণালয় কর্তৃক দেওয়া নথিতে যে অত্যাধুনিক যাত্রীসেবা ও বাণিজ্যিক সুবিধার কথা বলা হয়েছিল, তার কিছুই আজও বাস্তবায়িত হয়নি। আর এই অব্যবস্থাপনাই এখন বিদেশি নির্ভরতার প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

নিচতলা: শুধু বেঞ্চের সান্ত্বনা: ৪৬ হাজার ৭৩ বর্গফুট আয়তনের এই তলায় টিকিট কাউন্টার, এটিএম বুথ, ডাকঘর, লাগেজ লকার এবং দোকান থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে শুধু কয়েকটি বসার বেঞ্চ ছাড়া কোনো সরকারি বা বাণিজ্যিক পরিষেবা চালু নেই।

অন্ধকার বিলাসের স্তূপ: ৪২ হাজার ৭৭ বর্গফুট আয়তনের দ্বিতীয় তলায় ১৭টি দোকান, ফুড কোর্ট, ওয়েটিং লাউঞ্জ ও প্রার্থনা কক্ষের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি হলেও, নিচ থেকে তাকালে দেখা যায় ওপরের সব তলা বন্ধ এবং সম্পূর্ণ অন্ধকার।

তালাবদ্ধ বাণিজ্যিক সম্ভাবনা: তৃতীয় তলায় (৩৫ হাজার ৩২৫ বর্গফুট) ১৭টি দোকান ও শোরুম এবং চতুর্থ তলায় (৪৩ হাজার ৬৬ বর্গফুট) ৩৯টি হোটেল কক্ষ—এই বিশাল বাণিজ্যিক স্পেসগুলো তালাবদ্ধ থাকার কারণে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার অফিস স্পেস, মাল্টিপারপাস হল এবং রেস্টুরেন্ট সুবিধাগুলোও অব্যবহৃত। এস্কেলেটর, বেবি কেয়ার কর্নার, ইনফরমেশন ডেস্ক সহ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা তৈরি থাকার পরও এই অচলাবস্থা সরকারের পরিকল্পনাহীনতাকে প্রকট করে তুলেছে।

বিদেশি নির্ভরতা: জনগণের অর্থের অপচয়

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্টেশনটি পরিচালনার জন্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানের অভাব এবং আন্তর্জাতিক মানের পরিষেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই বিদেশি অপারেটরের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হচ্ছে।

অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান পূর্বে মন্তব্য করেছিলেন, “সব কিছুতে শুধু বিদেশিদের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়; দেশীয় প্রতিষ্ঠানও তৈরি করা জরুরি।” কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে স্পষ্ট যে, শত কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ করার পরও পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করা যায়নি। ফলস্বরূপ, জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই লাভজনক সম্পত্তি এখন বিদেশি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে স্টেশন থেকে আসা সম্ভাব্য বিপুল আয়ের নিয়ন্ত্রণ ও সুবিধা দেশের বাইরে চলে যাবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্মাণকাজ তদারকিতে থাকা বিদেশি সংস্থা সিআরইসি বা সিসিইসিসি-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোই সম্ভবত পরিচালনার সুযোগ পাবে। এটি হবে সরকারের চরম ব্যর্থতা এবং বিশাল অবকাঠামো নির্মাণেও দেশীয় সক্ষমতার প্রতি এক লজ্জাজনক আত্মসমর্পণ। যেই প্রকল্পে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে, সেখানে ২১৫ কোটি টাকার কেন্দ্রীয় স্থাপনাটিই যদি দেশীয় উদ্যোগে সচল না করা যায়, তবে পুরো প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

আরো পড়ুন

একটি মন্তব্য লিখুন

আমাদের সম্পর্কে

বাঙালীর সংবাদ বাংলা ভাষায়, সবার আগে সেরা সংবাদ পেতে বি-বাংলা ভিজিট করুন।

আজকের সর্বাধিক পঠিত

নিউজলেটার