জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) দরপত্রের শর্তানুযায়ী, প্রাথমিক ও ইবতেদায়ির বইয়ে জিএসএম (কাগজের পুরুত্ব) ৮০, ব্রাইটনেস ৮৫, ব্রাস্টিং ফ্যাক্টর ২০ ও অপাসিটি ৮৫ থাকার কথা।
২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ব্যবহৃত কাগজ ও ছাপার মান কেমন—তা জানতে কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে অনুসন্ধানের পাশাপাশি কাগজের মানও পরীক্ষা করা হয়। গত সপ্তাহে দুটি জেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ি পর্যায়ের মোট আটটি বই সংগ্রহ করা হয়।
অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসের নবম ও দশম শ্রেণির (ভোকেশনাল) বাংলা সাহিত্য বইয়ের জিএসএম পরীক্ষা করে ৭০-এর বদলে ৬৪ পাওয়া যায়। এ ছাড়া কর্ণফুলী আর্ট প্রেসের ইবতেদায়ি চতুর্থ শ্রেণির কুরআন মাজিদ ও তাজভিদের জিএসএম পরীক্ষা করে ৮০-এর বদলে ৭৬ পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের আটটি বই দেখিয়ে মতামত নেওয়া হয়। তাঁরা বলেন, এসব বই রিসাইকেলড কাগজ থেকে তৈরি। এতে ২০ শতাংশ ভার্জিন ও ৮০ শতাংশ রিসাইকেলড পাল্প ব্যবহার করা হয়েছে। রিসাইকেলড পাল্প থেকে তৈরি হলেও জিএসএম কেমন হবে, তা উৎপাদকের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু যদি রিসাইকেলড কাগজ ব্যবহার করা হয়, এতে ব্রাইটনেস, ব্রাস্টিং ফ্যাক্টর ও অপাসিটি ব্যাপকভাবে কমে আসবে। এই বইগুলোতেও একই ব্যাপার দেখা গেছে। এসব বই শিক্ষার্থীদের চোখের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
নিম্নমানের বইয়ের ব্যাপারে মতামত চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিম্নমানের বইয়ের ব্যাপারে আমাদের মনিটরিং অব্যাহত আছে। আমি সম্প্রতি এই দপ্তরের দায়িত্ব নিয়েছি। নিম্নমানের বই দিলে এনসিটিবির বিধান অনুযায়ী, সেগুলো রিপ্লেস করে দিতে বলা হয়। এতে প্রেস মালিকরা বেশির ভাগই বই রিপ্লেস করেন না। তাই এই শাস্তি যথেষ্ট নয়। ফলে এখনো কেউ কেউ নিম্নমানের বই করার চেষ্টা করছেন।’
মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এ বছর যারা নিম্নমানের বই দেবে, তাদের শুধু সেই বইগুলো রিপ্লেস করে দিলেই হবে না। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি এর পরের বছর তারা যাতে এনসিটিবির কোনো দরপত্রে অংশ নিতে না পারে, সে জন্য কালো তালিকাভুক্তও করা হবে।’
অনুসন্ধানের জন্য মাধ্যমিকের (ভোকেশনাল) ১০৮৩ ও ১০৮৪ লটের বই সংগ্রহ করা হয়েছে। এই দুই লটে মোট বই আট লাখ ১৯ হাজার ৮৬টি। ১০৮৩ লটের বই গাজীপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও রাজবাড়ী জেলায় পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে ১০৮৪ লটের বই সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নরসিংদী, শরীয়তপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুরে পাঠানো হয়েছে। এসব বইয়ের কাজ পেয়েছে অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস।
ইবতেদায়ির চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ২০৩২, ২০৩৪ ও ২০৩৫ লটের বই সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব লটে বইয়ের সংখ্যা ২০ লাখ ১১ হাজার ৮৫৬টি। কাজ পেয়েছে অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস। ২০৩২ লটের বই গেছে ঝালকাঠি, বরিশাল ও ভোলা জেলার ২১ উপজেলায়। ২০৩৪ লটের বই গেছে চট্টগ্রাম জেলার ২২ উপজেলায়। ২০৩৫ লটের বই গেছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায়।
অন্যদিকে কর্ণফুলী আর্ট প্রেস ইবতেদায়ির চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ২০২৮ ও ২০৩১ লটের ১৫ লাখ তিন হাজার ১৬৮টি বইয়ের কাজ পায়। ২০২৮ লটের বই যায় গাজীপুর, শরীয়তপুর, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, মাদারীপুর ও ফরিদপুর জেলার ৪১ উপজেলায়। ২০৩১ লটের বই যায় কিশোরগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুর ও নেত্রকোনা জেলার ৩৬ উপজেলায়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পাঠ্যবইয়ের মানের ব্যাপক অধঃপতন শুরু হয় ২০২০ শিক্ষাবর্ষ থেকে, অর্থাৎ যে বইয়ের কাজ ২০১৯ সালে করা হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিওন জাহাঙ্গীর আলম ওরফে পানি জাহাঙ্গীর ওই বছর থেকে এনসিটিবির পাঠ্যবইয়ের নিয়ন্ত্রণ নেন। তাঁরই সিন্ডিকেটের প্রতিষ্ঠান হচ্ছে অগ্রণী ও কর্ণফুলী প্রেস। তারা ওই বছরে এসেই ৩০০ কোটি টাকার বেশি বইয়ের কাজ পায়। এরপর টাকার অঙ্ক আরো বাড়তে থাকে। অগ্রণী প্রেসের মালিক কাউসার-উজ-জামান রুবেল ও কর্ণফুলী প্রেসের মালিক হাসান-উজ-জামান রবিন আপন দুই ভাই। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলেরও ওই সিন্ডিকেটের সঙ্গে বেশ সখ্য ছিল।
অগ্রণী প্রেসের মালিক কাউসার-উজ-জামান রুবেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সঠিক মানের কাগজে বই করছি। বই ছাপার আগে এনসিটিবি কাগজ পরীক্ষা করে। তাতে পাস করার পর সেই কাগজে আমরা বই ছাপাই।’
সূত্র জানায়, এ বছরও অগ্রণী ও কর্ণফুলী প্রেস তিন কোটি ১৫ লাখ ৮৩ হাজার ৫০২টি বই ছাপার কাজ পেয়েছে, যা মোট বইয়ের দশ ভাগের এক ভাগেরও বেশি। ২০০ কোটিরও বেশি টাকার এই কাজ তারা করছে। অগ্রণী প্রিন্টার্স পেয়েছে এক কোটি ৪১ লাখ ৮৪ হাজার ২৭১টি বই এবং কর্ণফুলী প্রেস পেয়েছে এক কোটি ৭৩ লাখ ৯৯ হাজার ২৩১টি বইয়ের কাজ।
বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এনসিটিবির দরপত্রের শর্তানুযায়ী বর্তমান বাজারদর হিসেবে প্রতিটন কাগজের দাম এক লাখ ১৫ হাজার টাকা। তবে অগ্রণী ও কর্ণফুলী তাদের মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ির বইয়ে যে রিসাইকেলড কাগজ ব্যবহার করেছে, এর দাম ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা। ফলে তারা তিন কোটি বইয়ে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা সরিয়েছে।
সূত্র জানায়, অগ্রণী ও কর্ণফুলী প্রেস নোয়াখালীতে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে গিয়ে এনসিটিবি ও ইন্সপেকশন এজেন্টের কর্মকর্তারা নানা ধরনের হুমকি-ধমকির শিকার হচ্ছেন। দুই প্রেসেই কিছু ভালোমানের কাগজ রাখা আছে। কেউ পরিদর্শনে গেলে ওই কাগজের রোল থেকে স্যাম্পল নিতে বাধ্য করা হয়। এমনকি এনসিটিবির কর্মকর্তারা উচ্চবাচ্য করলে তাঁদের বদলির হুমকিও দেওয়া হয়। ফলে ওই দুই প্রেসে এনসিটিবির কোনো কর্মকর্তাই পরিদর্শনে যেতে চান না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আগামী শিক্ষাবর্ষের সব বই শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিন তুলে দিতে হলে ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছতে হবে। কিন্তু ওই দুই প্রেসের ৬০ শতাংশের বেশি বই ছাপা এখনো বাকি। যে কাজ শেষ করতে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তারা চাইছে শেষ সময়ে বই সরবরাহ করতে, যাতে তখন মানের দিকে নজর দেওয়ার সময় না থাকে। তবে মাদরাসা ও কারিগরি দিকে নজর কম থাকায় সেখানে এখন অতি নিম্নমানের বই সরবরাহ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাবেক সরকারের কিছু দুর্নীতিবাজের আশীর্বাদপুষ্ট সিন্ডিকেট বিগত বছরগুলোতে নিম্নমানের বই সরবরাহ করেছে। চক্রটি এখনো এনসিটিবিতে বেশ সক্রিয়। তাদের কেউ কেউ এ বছরও নিম্নমানের বই সরবরাহ করছে বলে আমরা জেনেছি। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এখন খুবই জরুরি। এ বছর যে প্রতিষ্ঠানেরই নিম্নমানের বই পাওয়া যাবে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা উচিত। তাহলে পরবর্তী বছরগুলোতে আর কেউ নিম্নমানের বই দিতে সাহস পাবে না।’
