Friday, March 6, 2026

রক্তবীজ ২: বাংলা সিনেমায় রাজনৈতিক থ্রিলারের নতুন উচ্চতা/মালিহা মমতাজ

বিবাংলা ডেস্ক
০ মন্তব্য ২৮৬ views

রক্তবীজ : বাংলা সিনেমায় রাজনৈতিক থ্রিলারের নতুন উচ্চতা।

মালিহা মমতাজ

 

বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পটভূমিতে নির্মিত পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র ‘রক্তবীজ ২’ সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে, যা প্রণব মূখার্জীর বাস্তব ঘটনা এবং কূটনীতির ছায়ার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। উপমহাদেশের বিখ্যাত সাংবাদিক,লেখক,প্রেসক্লাব অব ইন্ডিয়ার সভাপতি গৌতম লাহিড়ীর বই ‘প্রণব মূখার্জী: রাজনীতি ও কূটনীতি’ এর ছায়া’ থেকে অনুপ্রাণিত এ সিনেমাটি গভীর একটি কাহিনী উপস্থাপন করেছে।

রক্তবীজ : বিশ্লেষণ রিভিউ

নির্দেশনা প্রেক্ষাপট:
নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখার্জী আবারও থ্রিলার জগতে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রয়াস নিয়েছেন রক্তবীজ –তে। পূর্বের রক্তবীজ‑এর ধারাবাহিকতায়, এই ছবিতে রাজনৈতিক থ্রিলার, সন্ত্রাসবাদ, সীমান্তের অন্তরায়, এবং দুই দেশের (ভারত ও বাংলাদেশ) সম্পর্কের সংকট ও উত্তেজনার ইমেজ জড়িয়ে আছে।

গল্প / স্ক্রিপ্ট

রক্তবীজ শুরু হয়ে যায় সরাসরি একটি বড়ও বিপজ্জনক পরিকল্পনার মাধ্যমে — নতুন খলনায়ক মুনির আলমের হাত ধরে। তাঁর উদ্দেশ্য, সীমান্ত পেরিয়ে দুই দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা এবং জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া। পরিচালক ও স্ক্রিপ্ট রাইটার জিনিয়া সেন গৌতম লাহিড়ির বই থেকে এই থ্রিলার কাহিনী খুব যত্নের সঙ্গে গড়েছেন — অতীতের কিছু ঘটনা, চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত জীবন, এবং রাজনৈতিক ও মানবিক উত্তেজনা প্রত্যেকই ধাপে ধাপে খুলতে দেখা যায়।

গল্পের পাঠ প্রায় পুরোপুরি শাসিত, থ্রেডগুলো রয়েছে স্পষ্টভাবে — তদন্ত, কি কুশলীভাবে খলনায়কের পরিকল্পনা ধরা পড়বে, কর্তব্যবোধ এবং নৈতিক দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ভালো ও মন্দের সংযোগ ইত্যাদি।

 

চরিত্র অভিনয়

আবির চট্টোপাধ্যায় (পঙ্কজ সিংহ/DIG বা তদন্ত কর্মকর্তা): যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ, যেখানে তিনি শুধু অ্যাকশন‑নায়ক নন, বরং চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অতীত ও দায়বোধের বোঝাও বহন করেন।
মিমি চক্রবর্তী (সংযুক্তা/SP বা পুলিশ কর্মকর্তা): শক্তিশালী উপস্থিতি, অ্যাকশন এবং সংলাপ–দুটোর মধ্যেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন। রোমান্সের অংশ আছে, তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো যখন সংযুক্তা কাজ করছে, দায়িত্ব পালন করছে, তখন সে দৃঢ় ও নির্ভেজাল।  
অঙ্কুশ হাজরা (মুনির আলম, খলনায়ক): তিনি এই ছবির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বগুলোর মধ্যে একজন। ভিলেন হিসেবে তার চরিত্রে রয়েছে একটি গভীর বিশ্লেষণ — শুধুমাত্র অপকরবেও নয়, তাঁর পেছনে ইতিহাস, ক্ষত, চিন্তা আছে। তার বেসিক ভূমিকাটি মনে রাখা যাবে।

অন্য চরিত্র যেমন ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়, কৌশানী মুখোপাধ্যায় ও সীমা বিশ্বাসদের পার্শ্বচরিত্রও গল্পকে মোটা দাগে ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

 

প্রযুক্তি, দিকনির্দেশনা সৃজনশীল উপাদান

  • চিত্রনাট্য স্ক্রিপ্টিং — জিনিয়া সেনের লেখা স্ক্রিপ্ট দ্রুত গতি ধরে রাখে, কখনও গুলি ছুঁড়ে দেয়, কখনও চরিত্রের অতীতে ফিরে যায়, সব মিলিয়ে আকর্ষণ ধরে রাখে। চিত্রগ্রহণ লোকেশন — সিনেমার দৃশ্যভান্ডার মার্জিত, সীমান্ত এলাকা,
  • শহর‑গ্রামের পার্থক্য, আন্তর্জাতিক স্থানে দৃশ্য প্রয়োগ সবই ভালোভাবে করা হয়েছে
  • অ্যাকশন এবং থ্রিলার সিকোয়েন্স — বেশিরভাগ সময় উত্তেজনাপূর্ণ ও নির্মিত হয়েছে দক্ষভাবে; তবে কিছু ক্লাইম্যাক্টিক অ্যাকশন দৃশ্য একটু দীর্ঘস্থায়ী অনুভূত হতে পারে।
  • সঙ্গীত গান — গানগুলোর মধ্যে যেমন „চোখের নীলে“ দেখা গেছে, কিছু গান ভালোভাবে গল্পে ঢুকে গেছে; তবে সামগ্রিক সুর বা ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর মাঝে মাঝে চাহিদামত গভীরতা দিতে পারছে না—কিন্তু কোনোরকম ব্যর্থ নয়।

শক্তি বিশেষ উৎকর্ষ

  1. দলনির্মাণ পারফরম্যান্স — প্রধান ও পার্শ্বচরিত্ররা সবাই যথেষ্ট বিষয়ে অবদান রেখেছেন, বিশেষ করে ভিলেনের ভূমিকায় অঙ্কুশ, নায়িকা ও নায়ক উভয়েই মান রক্ষা করেছেন।
  2. যুদ্ধ নৈতিকতা — শুধু থ্রিল ও অ্যাকশন নয়, মানুষের মন, দায়বোধ, বিচার, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট সব মিলিয়ে একটি চিন্তার ঘূর্ণিপাক সৃষ্টি করেছে।
  3. পেস উত্তেজনা — সিনেমাটি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত টানটান অনুভূতি রাখে; বড় ধরণের ফাঁক‑ফোকর কম।
  4. বার্তা সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা — সীমান্ত সন্ত্রাস, ভারতের ও বাংলাদেশের আন্তঃসম্পর্ক, রাষ্ট্র এবং সাধারণ মানুষের দায়‑দায়িত্বের প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে বোঝাপড়ার সাথে।

দুর্বল দিক

কিছু বিষয় আছে যা একটু উন্নত করা যেতে পারত:

  • কিছু অংশে সংলাপ বা ঘটনা এমন লাগে যেন দর্শকের জন্য বেশি পরিচিত ধাঁচের ক্লিশে উপাদান — কিছু সিদ্ধান্ত বা ঘটনাপ্রবাহ বেশি প্রত্যাশিত।
  • গান ও রোমান্টিক সাবপ্লট মাঝেমাঝে থ্রিলার এর গতি কিছুটা ধীর করে দেয়।
  • ক্লাইম্যাক্টিক মুহূর্তগুলো হতে পারে আরও সংক্ষিপ্ত এবং আরও টেনশন বজায় রেখে করা যেত।

উপসংহার

রক্তবীজ একটি শক্তিশালী থ্রিলার এবং একই সঙ্গে একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবেচনা। সিনেমার প্রতিটি দিক, বিশেষ করে কাহিনী, অভিনয়, এবং টেকনিক্যাল কাজ গুলো সাফল্যের সাথে একত্রিত হয়েছে।
সিনেমাটির পেস, চরিত্রগুলোর জটিলতা, এবং তার সাসপেন্সপূর্ণ মুহূর্তগুলো দর্শককে ধরে রাখে। যদিও কিছু জায়গায় গল্পের গতি বা সংলাপের গভীরতা আরও উন্নত হতে পারত, তবুও এটি একটি দর্শনীয় সিনেমা, যা থ্রিলার এবং রাজনৈতিক গল্পে আগ্রহী দর্শকদের জন্য আদর্শ।

এই সিনেমাটি শুধুমাত্র বিনোদনের জন্যই নয়, বরং দর্শকদের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিক, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করবে। রক্তবীজ তাই, সত্যি বললে, ভারতের বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম একটি উচ্চমানের কাজ।

রক্তবীজ আমাদের শেখায়—সীমান্ত শুধু ভূগোল নয়, এটি মানুষের মনেও আঁকা এক দাগ।
আর সেই দাগের ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে সত্যিকারের রক্তবীজ।

 

আরো পড়ুন

একটি মন্তব্য লিখুন

আমাদের সম্পর্কে

বাঙালীর সংবাদ বাংলা ভাষায়, সবার আগে সেরা সংবাদ পেতে বি-বাংলা ভিজিট করুন।

আজকের সর্বাধিক পঠিত

নিউজলেটার