চট্টগ্রাম বন্দরে ফি বৃদ্ধি
পণ্য পরিবহন বন্ধ, কনটেইনারজট
- ভারী গাড়ি প্রবেশের মাশুল ৫৭ থেকে ২৩০ টাকা করা হয়েছে
- মালিকরা বলছেন, ‘স্বেচ্ছায় গাড়ি বন্ধ’
- ২৪ ঘণ্টায় ডেলিভারি কমেছে ৯৯%
- ট্যারিফ নিয়ে সমাধান না হলে বন্দর বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ ফি (গেট পাস ফি) চার গুণের বেশি বাড়ানোর প্রতিবাদে পণ্য পরিবহন কার্যক্রমে চরম অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। আন্ত জেলা রুটে কনটেইনার পরিবহনকারী ট্রেলার মালিকরা গতকাল শনিবার সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দরে ভারী যান প্রবেশ না করানোর ঘোষণা দিয়েছেন। পরিবহন মালিক সমিতি এটিকে ধর্মঘট নয়, বরং বাড়তি ফিয়ের কারণে মালিকদের স্বেচ্ছায় গাড়ি চালানো বন্ধ রাখার কর্মসূচি বলে জানিয়েছে।
বন্দরের এই অচলাবস্থার কারণে আমদানি পণ্য বন্দর থেকে বের করার কাজ বন্ধ ছিল।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) গত ১৫ অক্টোবর থেকে নতুন শুল্ককাঠামো কার্যকর করেছে।
তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় গতকাল সকাল ৬টা থেকে যানবাহন চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেন মালিক-শ্রমিকরা। সকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে কোনো পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা ট্রেলার ঢোকেনি। এর ফলে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস স্বাভাবিক থাকলেও কনটেইনারের স্তূপ জমতে শুরু করে। বন্দর সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত তার আগের ২৪ ঘণ্টায় আমদানিকারকরা মাত্র আটটি কনটেইনার নিতে পেরেছেন।
চট্টগ্রাম প্রাইম মুভার ও ফ্ল্যাটবেড ওনারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, ৫৭ টাকার গেট পাস ২৩০ টাকা করায় মালিকরা স্বেচ্ছায় গাড়ি চালানো বন্ধ রেখেছেন। অতিরিক্ত ফি কে দেবেন, শ্রমিক না মালিক, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়াও এই পরিস্থিতির একটি কারণ। বন্দর চেয়ারম্যান ঢাকা থেকে ফিরলে পুনরায় আলোচনার আশা করছি।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাইম মুভার ও ট্রেলার শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবুল খায়ের বলেন, ‘অংশীজনদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই ফি বাড়ানো হয়েছে। কে এই বাড়তি খরচ দেবে—তা না জানিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ হঠাৎ সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তাই আমরা গাড়ি চালানো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ পরিবহন মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে বন্দরসহ বিভিন্ন পাইকারি মার্কেটে প্রায় সাত হাজার প্রাইম মুভার, কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাক বন্দরের পণ্য পরিবহন করে। যান চলাচল বন্ধ থাকায় রপ্তানি কার্যক্রমও চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইসিডিএ) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, ১৯টি ডিপোতে স্বাভাবিক সময়ে আট হাজার টিইইউএস রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার থাকে। ধর্মঘট থাকলে কনটেইনার জাহাজে না ওঠাতে পারায় শিডিউল বিপর্যয় হয়, যা স্বাভাবিক হতে কমপক্ষে এক সপ্তাহ সময় লাগে।
পোশাক রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, পণ্য সময়মতো জাহাজে না ওঠাতে পারলে শিপমেন্ট বাতিল ও ডিসকাউন্টসহ নানা জটিলতায় পড়তে হয়। চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল আলম বলেন, পণ্য পরিবহনের যান চলাচল বন্ধ থাকায় আমদানি পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। এতে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বাড়ছে। এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়বে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী এস এম আবু তৈয়ব পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত সমন্বিত আলোচনা ও ফি কাঠামো পুনর্বিবেচনার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আগাম আলোচনার অভাবে এই অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রমে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ট্যারিফ নিয়ে এক সপ্তাহে সমাধান না হলে বন্দর বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি : এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন পোর্ট ইউজারস ফোরামের নেতারা। এই বন্দরে বিভিন্ন সেবায় ‘অযৌক্তিক ও অতিরিক্ত’ ট্যারিফ আরোপের প্রতিবাদে ফোরাম নেতারা গতকাল প্রতিবাদসভায় এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তাঁরা বলেছেন, এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন ট্যারিফ সমস্যার সমাধান না হলে চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ করে দেওয়া হবে। গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম মহানগরের একটি কনভেনশন হলে পোর্ট ইউজারস ফোরাম প্রতিবাদসভার আয়োজন করে।
ফোরামের সভাপতি আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী সভায় সভাপতিত্ব করেন। সভায় স্বাগত বক্তব্যে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক এম এ সালাম বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। ৮৫ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। বন্দরের নতুন ট্যারিফে ব্যবসায়ীরা ইনসিকিউরড ফিল করছেন। আমি বিশ্বাস করি, আমরা সমস্বরে না বললে সমাধান হবে না। চট্টগ্রাম বন্দর একটি সেবাধর্মী সংস্থা। এই সেবাকেন্দ্র লোকসানে নেই। আড়াই-তিন হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। তাহলে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে কেন এত কারসাজি? ট্রেলার ধর্মঘট শুরু হয়েছে, আমাদের কনটেইনার যাবে না। বন্দরের ট্যারিফ শিডিউল পুনর্নির্ধারণ করার দাবি জানাই।’ বিজিএমইএর পরিচালক এম ডি এম মহিউদ্দিন বলেন, ‘বন্দরের নতুন ট্যারিফে ব্যবসায়ীরা প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, পরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। আমেরিকার ট্যারিফ নিয়ে আমরা সুখে নেই। এর মধ্যে বন্দরের ট্যারিফ বৃদ্ধি কাম্য নয়।’
সভায় বক্তব্য দেন শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতা নজরুল ইসলাম, বন্দর ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির সোহেল, চট্টগ্রাম প্রাইম মুভার ও ফ্ল্যাটবেড ওনারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন, বাফার পরিচালক অমিয় শঙ্কর বর্মণ, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল আলম প্রমুখ।
